ছোট গল্প
------------
অনাথ
------------------
মনি জামান
-----------------
২৪-১২-২০১৯
আমি আজ অনাথ,আমার বয়স পাঁচ বছর যখন তখন আমার বাবা মারা যান।
আমার বাবা দিনমুজরের কাজ করত,কিন্তু আমাদের সংসারে মা বাবা দাদি আর আমি।
দারুণ সুখের সংসার ছিলো আমাদের,
ছোট পরিবার আমাদের ভিটেবাড়ি ছাড়া আর কোন জমি ছিলনা।
তবুও বাবা কখনো সংসারে অভাব অনটন বুঝতে দিতো না কখনো,
হঠাৎ আমার বাবা একদিন অসুস্থ হয়ে পড়লো।ডাক্তার কবিরাজ দেখাতো,কিন্তু সুস্থ হওয়া তো দুরের কথা,আমার বাবার অবনতি হলো শরীরের।আমাদের গরু ছাগল দুটো বিক্রি করে বাবার চিকিৎসা করানো হলো,কিন্তু বাবা আর সুস্থ হলো না,আমার বাবা ধীরে ধীরে মৃত্যু বরণ করলো।
বাবার মৃত্যুর পর মা খুব ভেঙ্গে পড়েছিল,আমাদের আর কিছু ছিলনা যে তাই বিক্রি করে আমরা চাল ডাল কিনবো।কোন উপায় না পেয়ে পেটের তাড়নায় মা পরের বাড়ি কাজ করতে শুরু করলো,দিন শেষে যা ভাত পেত কোন রকমে মা আমাকে এবং দাদি কে খাইয়ে মা খেত।
এভাবেই দিন যেতে লাগলো,হঠাৎ মা'ও অসুস্থ্য হয়ে পড়ল একদিন।
অর্থাভাবে ঠিক মত ঔষধও জুটতো না,গ্রাম্য কবিরাজ মাঝে মাঝে এসে দেখে যেত।মার শরীর ধীরে ধীরে খারাপের দিকে যেতে শুরু করলো। একদিন রাতে মা আর আমি ঘুমিয়ে আছি,ভোর হল আযান হচ্ছে,মা'কে ডাকলাম মা মা বলে,মা ডাক শুনলো না,আবার ডাকলাম এবারও আমার মা ডাক শুনলো না।আমি কাঁদতে শুরু করলাম আমার কান্না শুনে আমার বড় চাচি এলো এবং বলল, কি হয়েছে কাঁদছিস কেন ময়না? আমি চাচিকে বললাম মা উঠছেনা,শুনে চাচি আমার মাকে ডাকলো,মা ডাক শুনলো না।চাচি মায়ের গায় হাত দিয়ে ডাকলো মা এবারও ডাক শুনলো না।চাচি চিৎকার দিল তোরা কোথায় কে আছিস,ময়নার মা মরে গেছে।
চাচির চেঁচামেচিতে পাড়ার লোকেরা সবাই এলো আমাদের বাড়িতে,আমাকে সবাই কাছে ডেকে মাথায় হাত বুলায়ে আদর করতে শুরু করলো,তারপর মাকে ঘর থেকে বাইরে এনে শুয়ে দিলো,পাড়ার চাচিরা মা'কে গোসল করালো তারপর কাফন পরালো,এক চাচা এসে বললো কবর খোড়া শেষ,হুজুর এলো জানাজার নামায পড়ালো তারপর আমার মা'কে কবর স্থানে নিয়ে গেলো,তাপর কবর দিলো।এই দুনিয়ায় আপন বলতে আমার আর কেউ রইলো না।আমি অনাথ হলাম,কিছুদিন যেতে না যেতে আমার চাচা চাচিও আমার আর খেতে দিতনা,আমার দাদী ছিল কিন্তু সে পঙ্গু এবং বৃদ্ধা,রাতে দাদীর কাছে ঘুমাতাম,জেগে উঠে মা মা বলে কাঁদতাম।দাদী স্নেহের হাত বুলাতো আমার মাথায় আর কেঁদে কেঁদে আল্লাহর কাছে দোয়া করত আর বলতো,আল্লা আর কোন দাদীকে এমন কষ্ট দিওনা।
সকাল হলে খিদের জ্বালায় মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরতাম,অনেকে কুকুরকে অনেক ভাত দিত,গরু ছাগল,হাস মুরগীকে ভাত ছড়াত।আমি চেয়ে চেয়ে দেখতাম দু'চোখে পানি আসতো, কেউ আমার খিদের কথা জানতো না,এভাবে কত দিন অভুক্ত থেকেছি আমি জানিনা।অনেকে বাজার করে আমাকে দিতো বাড়ি পৌছে দেবার জন্য,আমি বাজার নিয়ে যেতাম একটা টাকা দিত আমাকে,ঐ টাকা দিয়ে একটা পাউরুটিও হত না।পেটে খিদে তাই আর একটা টাকার জন্য,মানুষ খুঁজতাম। অনেক কষ্টে জোগাড় করে পাউরুটি কিনে খেতাম।
হঠাৎ একটা লোক আমাকে ডাকলো বলল,খোকা এই পাঁচটা টাকা নাও,আমি আনন্দে পাঁচ টাকা নিলাম।মনে হল পৃথিবীর সব পাউরুটি আজ কিনবো আর পেট ভরে খাব,পরে শুনেছি ঐ লোকটা আমার বাবার এক বন্ধু ছিলো।
এভাবে যেতে যেতে একদিন আমার দাদীও মৃত্যুবরণ করলো,আমার শেষ আশ্রয়ের সমাপ্তি হল,মা বাবার কথা মনে পড়ত অঝোরে কাঁদতাম,বছর শেষে ঈদ এলো আমার বয়সী সবাই নতুন জামা কাপড় পরেছে।
আর আমি একজনের দেওয়া ছেড়া জামা পরেছি আজ,ঈদের অফুরন্ত আনন্দ দুটি চোখে,সবাই সেমায় রান্না করেছে তাদের ছেলে মেয়েরা আনন্দন করে খাচ্ছে,আর আমি শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছি,কেউ ডাকলোও না আমার দুচোখে জল বাবা মায়ের কথা মনে পড়ছে বার বার,আজ যদি আমার বাবা থাকতো টাকা দিত নতুন জামা কিনে দিত,কত আনন্দই না হত।
আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি পাড়ার একটা লোক আমার চোখের পানি দেখে,আমাকে ডাকলো।
আমি কাছে গেলাম লোকটি আমাকে দশটি টাকা দিলো আমি টাকাটা হাতে নিলাম,খুশিতে চোখে পানি পড়ছে,মনে হলো আমার বাবা এ টাকা দিয়েছে।ঈদেট নামায শেষ হল,আমার চাচা আজ আদর করে আমাকে ডেকে কাছে নিয়ে বলল, ময়না চল সেমায় খাবি,আমি খুশিতে কেঁদে ফেলাম।
আজ মনে হল বাবা ডাকছে আমাকে,চাচার বাড়ি খেলাম পেট ভরে সেমাই।রাতেও খেলাম মাংস,এ মাংস আমার অনাথ জীবনের প্রথম খাওয়া, ঈদের পরদিন সকালে একটি লোক এলো আমাকে নিয়ে যাবে ঢাকায় কোন অনাথ আশ্রমে,জানি না কে খবর দিয়ে এনেছিলো লোকটাকে।আমাকে লোকটির হাতে তুলে দিলো আমার চাচা,আমার চাচার আজ বুঝি এক অনাথের দায় মুক্তি হল।
আমাকে নিয়ে লোকটা রওনা হলো,কিন্তু মায়ের কবরের দিকে তাকিয়ে আমি কেঁদে উঠলাম আর মনে মনে বললাম,মা তোমাকে রেখে যাচ্ছি ভাল থেকো মা।দু'চোখ ভেঙ্গে অশ্রু ঝরছে আমার, কিন্তু এ অনাথের অশ্রুটুকু মুছে দেবার মত আপন বলতে যে এ পৃথিবীতে কেউ আর আমার নেই।এইটুকু আজ বুঝতে পারলাম সত্যি আমার কেউ নেই,শুধু মাকে ডাকলাম মাও অভিমান করে একটা বারের জন্যও ডাক শুনলো না আজ,কারণ আমি যে অনাথ!
------------
অনাথ
------------------
মনি জামান
-----------------
২৪-১২-২০১৯
আমি আজ অনাথ,আমার বয়স পাঁচ বছর যখন তখন আমার বাবা মারা যান।
আমার বাবা দিনমুজরের কাজ করত,কিন্তু আমাদের সংসারে মা বাবা দাদি আর আমি।
দারুণ সুখের সংসার ছিলো আমাদের,
ছোট পরিবার আমাদের ভিটেবাড়ি ছাড়া আর কোন জমি ছিলনা।
তবুও বাবা কখনো সংসারে অভাব অনটন বুঝতে দিতো না কখনো,
হঠাৎ আমার বাবা একদিন অসুস্থ হয়ে পড়লো।ডাক্তার কবিরাজ দেখাতো,কিন্তু সুস্থ হওয়া তো দুরের কথা,আমার বাবার অবনতি হলো শরীরের।আমাদের গরু ছাগল দুটো বিক্রি করে বাবার চিকিৎসা করানো হলো,কিন্তু বাবা আর সুস্থ হলো না,আমার বাবা ধীরে ধীরে মৃত্যু বরণ করলো।
বাবার মৃত্যুর পর মা খুব ভেঙ্গে পড়েছিল,আমাদের আর কিছু ছিলনা যে তাই বিক্রি করে আমরা চাল ডাল কিনবো।কোন উপায় না পেয়ে পেটের তাড়নায় মা পরের বাড়ি কাজ করতে শুরু করলো,দিন শেষে যা ভাত পেত কোন রকমে মা আমাকে এবং দাদি কে খাইয়ে মা খেত।
এভাবেই দিন যেতে লাগলো,হঠাৎ মা'ও অসুস্থ্য হয়ে পড়ল একদিন।
অর্থাভাবে ঠিক মত ঔষধও জুটতো না,গ্রাম্য কবিরাজ মাঝে মাঝে এসে দেখে যেত।মার শরীর ধীরে ধীরে খারাপের দিকে যেতে শুরু করলো। একদিন রাতে মা আর আমি ঘুমিয়ে আছি,ভোর হল আযান হচ্ছে,মা'কে ডাকলাম মা মা বলে,মা ডাক শুনলো না,আবার ডাকলাম এবারও আমার মা ডাক শুনলো না।আমি কাঁদতে শুরু করলাম আমার কান্না শুনে আমার বড় চাচি এলো এবং বলল, কি হয়েছে কাঁদছিস কেন ময়না? আমি চাচিকে বললাম মা উঠছেনা,শুনে চাচি আমার মাকে ডাকলো,মা ডাক শুনলো না।চাচি মায়ের গায় হাত দিয়ে ডাকলো মা এবারও ডাক শুনলো না।চাচি চিৎকার দিল তোরা কোথায় কে আছিস,ময়নার মা মরে গেছে।
চাচির চেঁচামেচিতে পাড়ার লোকেরা সবাই এলো আমাদের বাড়িতে,আমাকে সবাই কাছে ডেকে মাথায় হাত বুলায়ে আদর করতে শুরু করলো,তারপর মাকে ঘর থেকে বাইরে এনে শুয়ে দিলো,পাড়ার চাচিরা মা'কে গোসল করালো তারপর কাফন পরালো,এক চাচা এসে বললো কবর খোড়া শেষ,হুজুর এলো জানাজার নামায পড়ালো তারপর আমার মা'কে কবর স্থানে নিয়ে গেলো,তাপর কবর দিলো।এই দুনিয়ায় আপন বলতে আমার আর কেউ রইলো না।আমি অনাথ হলাম,কিছুদিন যেতে না যেতে আমার চাচা চাচিও আমার আর খেতে দিতনা,আমার দাদী ছিল কিন্তু সে পঙ্গু এবং বৃদ্ধা,রাতে দাদীর কাছে ঘুমাতাম,জেগে উঠে মা মা বলে কাঁদতাম।দাদী স্নেহের হাত বুলাতো আমার মাথায় আর কেঁদে কেঁদে আল্লাহর কাছে দোয়া করত আর বলতো,আল্লা আর কোন দাদীকে এমন কষ্ট দিওনা।
সকাল হলে খিদের জ্বালায় মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরতাম,অনেকে কুকুরকে অনেক ভাত দিত,গরু ছাগল,হাস মুরগীকে ভাত ছড়াত।আমি চেয়ে চেয়ে দেখতাম দু'চোখে পানি আসতো, কেউ আমার খিদের কথা জানতো না,এভাবে কত দিন অভুক্ত থেকেছি আমি জানিনা।অনেকে বাজার করে আমাকে দিতো বাড়ি পৌছে দেবার জন্য,আমি বাজার নিয়ে যেতাম একটা টাকা দিত আমাকে,ঐ টাকা দিয়ে একটা পাউরুটিও হত না।পেটে খিদে তাই আর একটা টাকার জন্য,মানুষ খুঁজতাম। অনেক কষ্টে জোগাড় করে পাউরুটি কিনে খেতাম।
হঠাৎ একটা লোক আমাকে ডাকলো বলল,খোকা এই পাঁচটা টাকা নাও,আমি আনন্দে পাঁচ টাকা নিলাম।মনে হল পৃথিবীর সব পাউরুটি আজ কিনবো আর পেট ভরে খাব,পরে শুনেছি ঐ লোকটা আমার বাবার এক বন্ধু ছিলো।
এভাবে যেতে যেতে একদিন আমার দাদীও মৃত্যুবরণ করলো,আমার শেষ আশ্রয়ের সমাপ্তি হল,মা বাবার কথা মনে পড়ত অঝোরে কাঁদতাম,বছর শেষে ঈদ এলো আমার বয়সী সবাই নতুন জামা কাপড় পরেছে।
আর আমি একজনের দেওয়া ছেড়া জামা পরেছি আজ,ঈদের অফুরন্ত আনন্দ দুটি চোখে,সবাই সেমায় রান্না করেছে তাদের ছেলে মেয়েরা আনন্দন করে খাচ্ছে,আর আমি শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছি,কেউ ডাকলোও না আমার দুচোখে জল বাবা মায়ের কথা মনে পড়ছে বার বার,আজ যদি আমার বাবা থাকতো টাকা দিত নতুন জামা কিনে দিত,কত আনন্দই না হত।
আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি পাড়ার একটা লোক আমার চোখের পানি দেখে,আমাকে ডাকলো।
আমি কাছে গেলাম লোকটি আমাকে দশটি টাকা দিলো আমি টাকাটা হাতে নিলাম,খুশিতে চোখে পানি পড়ছে,মনে হলো আমার বাবা এ টাকা দিয়েছে।ঈদেট নামায শেষ হল,আমার চাচা আজ আদর করে আমাকে ডেকে কাছে নিয়ে বলল, ময়না চল সেমায় খাবি,আমি খুশিতে কেঁদে ফেলাম।
আজ মনে হল বাবা ডাকছে আমাকে,চাচার বাড়ি খেলাম পেট ভরে সেমাই।রাতেও খেলাম মাংস,এ মাংস আমার অনাথ জীবনের প্রথম খাওয়া, ঈদের পরদিন সকালে একটি লোক এলো আমাকে নিয়ে যাবে ঢাকায় কোন অনাথ আশ্রমে,জানি না কে খবর দিয়ে এনেছিলো লোকটাকে।আমাকে লোকটির হাতে তুলে দিলো আমার চাচা,আমার চাচার আজ বুঝি এক অনাথের দায় মুক্তি হল।
আমাকে নিয়ে লোকটা রওনা হলো,কিন্তু মায়ের কবরের দিকে তাকিয়ে আমি কেঁদে উঠলাম আর মনে মনে বললাম,মা তোমাকে রেখে যাচ্ছি ভাল থেকো মা।দু'চোখ ভেঙ্গে অশ্রু ঝরছে আমার, কিন্তু এ অনাথের অশ্রুটুকু মুছে দেবার মত আপন বলতে যে এ পৃথিবীতে কেউ আর আমার নেই।এইটুকু আজ বুঝতে পারলাম সত্যি আমার কেউ নেই,শুধু মাকে ডাকলাম মাও অভিমান করে একটা বারের জন্যও ডাক শুনলো না আজ,কারণ আমি যে অনাথ!


0 Comments